কক্সবাজার সৈকত ভ্রমণে আসা পযটকের আকর্ষণ বালুচরে দাঁড়িয়ে পশ্চিামাকাশে অস্তেচলা সূর্যাস্ত দেখা
দরজায় কড়া নাড়ছে খুশির পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদের টানা কয়েক দিনের ছুটি কাটাতে ভ্রমণপিপাসু মানুষের পছন্দের জায়গার শীর্ষে থাকে বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত।
গত বছর ঈদের টানা পাঁচ দিনের ছুটিতে সৈকতে সাড়ে চার লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটেছিল। হোটেল, রেস্তোরাঁসহ নানা খাতে তখন ব্যবসা হয়েছিল হাজার কোটি টাকার। এবারও অন্তত চার লাখ পর্যটকের সমাগম আশা করছেন এ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
কক্সবাজারে পর্যটকের রাতযাপনের জন্য হোটেল, রিসোর্ট, গেস্টহাউজ, কটেজ আছে পাঁচ শতাধিক। এসবে দৈনিক ধারণক্ষমতা ১ লাখ ২৮ হাজার জানিয়ে কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, আজ বুধবার বেলা ১১টা পর্যন্ত হোটেল, গেস্টগাউসগুলোর ৮০ শতাংশ কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। অবশিষ্ট ২০ শতাংশ কক্ষও আজ বুধবার অথবা আগামীকাল বৃহস্পতিবার দুপুরের মধ্যে বুকিং হয়ে যেতে পারে।
বিপুলসংখ্যক পর্যটককে বরণ করতে পাঁচ শতাধিক হোটেল, গেস্টহাউস, রিসোর্ট ও সাত শতাধিক রেস্তোরাঁ প্রস্তুত জানিয়ে আবুল কাশেম সিকদার বলেন, পবিত্র রমজান উপলক্ষে সব কটি রেস্তোরাঁ বন্ধ ছিল। পর্যটক না থাকায় খালি পড়ে ছিল হোটেল, গেস্টগাউস, রিসোর্টগুলো। রোজার মাসে অধিকাংশ হোটেল, রেস্তারাঁর সংস্কার হয়েছে, তবে ভাড়া বাড়ানো হয়নি।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, এবারের ঈদের ছুটির প্রথম পাঁচ দিনে, অর্থাৎ ১২ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৫ দিন সৈকতে ৪ লাখের বেশি পর্যটকের সমাগম ঘটতে পারে।
পর্যটকেরা সমুদ্রের লোনা জলে শরীর ভেজানোর পাশাপাশি দৃষ্টিনন্দন কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ, সাগরদ্বীপ মহেশখালী ও সোনাদিয়া, টেকনাফের নাফ নদীর মিয়ানমার সীমান্ত, রামুর বৌদ্ধপল্লি, চকরিয়ার বঙ্গবন্ধু ডুলাহাজারা সাফারি পার্কসহ দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে কাটাবেন।
তখন হোটেল, গেস্টগাউস, রেস্তোরাঁসহ পর্যটন–সংশ্লিষ্ট ব্যবসা খাতে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে। আগের বছর ব্যবসা হয়েছিল প্রায় ৮০০ কোটি টাকা।
কক্সবাজারে পযটকের নতুন আকর্ষণ মেরিন ড্রাইভ সড়ক। সড়কের পশ্চিম পাশে সমুদ্রসৈকত, আর পূর্বপাশে সবুজ পাহাড় ও লোকবসতি। পাটোয়ারটেক সৈকতের দৃশ্যপ্রস্তুত হোটেল-রেস্তোরাঁ, বিনোদনকেন্দ্র
হোটেল মালিকেরা বলেন, এবার ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারের চাহিদার অতিরিক্ত পর্যটকের আগমন ঘটতে পারে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে বান্দরবানের ব্যাংক ডাকাতি, অপহরণ ও গ্রেপ্তার অভিযানের কারণে সেখানকার বিনোদনকেন্দ্রগুলো অনিরাপদ হয়ে পড়েছে।
ঈদের ছুটিতে যাঁরা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি ভ্রমণের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন, তাঁরা কক্সবাজারের চিন্তা করছেন। তা ছাড়া ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেল যোগাযোগ চালু হওয়ায় পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত হয়েছে।
কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম নেওয়াজ বলেন, এবারের ঈদের ছুটিতে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের কক্ষভাড়ার বিপরীতে ছাড় বা বিশেষ রেয়াত দেওয়া হচ্ছে না, ঈদের আগে রমজানের পুরো ১ মাস সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছিল।
তবে পর্যটকের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত কক্ষভাড়া আদায় হচ্ছে কি না, তা সমিতির পক্ষ থেকে কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে।
আজ দুপুর পর্যন্ত সৈকতের হোটেল-মোটেল এলাকার অর্ধশতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউসে গিয়ে দেখা গেছে ৮০ শতাংশ কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। সৈকতের পাশে পাঁচ তারকা হোটেল সিগাল, ওশান প্যারাডাইস, সায়মান বিচ রিসোর্ট, হোটেল কক্স টুডে, হোটেল কল্লোল, মারমেইড বিচ রিসোর্টসহ কলাতলী অন্তত ৬০টি হোটেল, গেস্টহাউস, রিসোর্ট ও কটেজে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কক্ষ ১৩ এপ্রিল থেকে তিন দিন বুকড করা হয়েছে।
দুপুরে সৈকতের কলাতলী পয়েন্টে গিয়ে দেখা গেছে, দুই কিলোমিটার লম্বা সৈকত খালি পড়ে আছে। সৈকতজুড়ে চার শতাধিক কিটকট (চেয়ার-ছাতা) বসানো হলেও সেখানে কেউ নেই। সৈকতের আশপাশের দোকানপাট, শামুক, ঝিনুক দিয়ে তৈরি রকমারি পণ্য বিক্রির দোকান, রেস্তোরাঁ ও শুঁটকির দোকানও বন্ধ।
একই দৃশ্য উত্তর পাশের সুগন্ধা, সিগাল ও লাবণী সৈকতেরও। পুরো চার কিলোমিটারের এই সৈকতে হাতে গোনা কয়েকজন নারী–পুরুষকে সমুদ্রে গোসল করতে দেখা গেল।
পর্যটকদের ছবি তুলে দেওয়ার জন্য সৈকতের মোড়ে মোড়ে শতাধিক ভ্রাম্যমাণ আলোকচিত্রী দাঁড়িয়ে থাকলেও ছবি তোলার মতো কাউকে খুঁজে পাচ্ছেন না তাঁরা।
দুপুরে সুগন্ধা সৈকতে কথা হয় সমুদ্রে গোসলে নেমে নিখোঁজ পর্যটকদের উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘সি-সেফ লাইফ গার্ড’–এর সুপারভাইজার সিফাত সাইফুল্লাহর সঙ্গে। তিনি বলেন, রোজার মাসেও এই সুগন্ধা সৈকতে কয়েক হাজার পর্যটকের সমাগম ঘটেছিল।
আগামীকাল ঈদুল ফিতর। ঈদ উদ্যাপন নিয়ে সবাই ব্যস্ত। এ কারণে সৈকত ফাঁকা হয়ে পড়েছে। তবে ঈদের দিন অন্তত ১০ হাজার পর্যটকের সমাগম ঘটবে। ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকে টানা কয়েক দিন প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ মানুষ সমুদ্র ভ্রমণে আসতে পারে। অতীতের ঈদের ছুটিতে এমনটাই দেখা গেছে।
বিপুলসংখ্যক পর্যটকের খাবারের চাহিদা মেটাতে বন্ধ থাকা সাত শতাধিক রেস্তোরাঁ খুলতে শুরু করেছে বলে জানালেন কক্সবাজার রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম (ডালিম)।
তিনি বলেন, সৈকত ভ্রমণে আসা পর্যটকদের কাছ থেকে খাবারের অতিরিক্ত মূল্য আদায় হলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খাবার টেবিলে মূল্যতালিকা রাখা থাকে। পর্যটকেরা তালিকা দেখেই যেন খাবারের অর্ডার করেন।
জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান বলেন, ভ্রমণে আসা পর্যটকের সার্বিক নিরাপত্তা এবং দুর্ভোগ হয়রানি রোধে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত হোটেলভাড়া এবং খাবারের মূল্য বাড়িয়ে আদায় হচ্ছে কি না, তা তদারকির জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে নামানো হয়েছে।
অভিযোগ জানানোর জন্য সৈকত এলাকার একাধিক অভিযোগ ও সেবাকেন্দ্র চালু করা হয়েছে। পর্যটক হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



No comments:
Post a Comment