পাকিস্তান ও ইসরায়েলের পতাকা
ইসরায়েল ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার একটি আশা দেখা যাচ্ছিল। তবে গাজায় সংঘাত শুরুর পর দেশটির মানুষের মধ্যে চরম ইসরায়েল–বিদ্বেষ দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে পাকিস্তান সফরে গেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি। এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তান–ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া কতটা সম্ভব, আর পশ্চিমা ও উপসাগরীয় মিত্রদের টপকে ইসলামাবাদ আদৌ তেহরানের হাত ধরবে কি না—সেসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন লন্ডনভিত্তিক পাকিস্তানি সাংবাদিক হামজা আজহার সালাম।
ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ২২ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পা রাখেন। তাঁর এ সফর অবাক করেছে অনেককে। এ তালিকায় রয়েছে এমন অনেক পক্ষ, যারা চাইত না রাইসি আসলেই এ সফরে যান। বিস্মিত হয়েছেন পাকিস্তানের অনেকেও।
পাকিস্তান ও ইরান প্রতিবেশী। দীর্ঘ সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তবে সম্প্রতি মুখোমুখি অবস্থানে যায় তেহরান ও ইসলামাবাদ। চলতি বছরের শুরুর দিকে একে–অপরের সীমান্ত এলাকায় পাল্টাপাল্টি বিমান হামলা চালায় দুই দেশ। এতে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি দেখা দেয়।
গত ১৭ জানুয়ারি পাকিস্তানে প্রথম বিমান হামলা চালায় তেহরান। পাকিস্তানে অবস্থান করা ইরানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী জাইশ আল–আদলের অবস্থান লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছিল দেশটি।
হামলায় দুই শিশু নিহত ও তিনজন আহত হয় বলে দাবি করে ইসলামাবাদ। পরে ইরানে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের লক্ষ্য করে পাল্টা বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান। এতে নিহত হন ৯ জন।
এ ঘটনার পর অল্প সময়ের জন্য পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থবির ছিল। পরে তা আবার স্বাভাবিক হয়েছে। এর কয়েক মাস পরেই ইসলামাবাদ, লাহোর ও করাচি সফরে গেলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। তাঁর সফরের আগে ইসলামাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নামও দেওয়া হয়েছে ‘ইরান অ্যাভিনিউ’।
ইসরায়েলের বিষয়ে পাকিস্তানের কোনো পদক্ষেপের ইঙ্গিত পাওয়া যাবে দেশটির ‘বড় ভাই’ সৌদি আরবের তৎপরতা থেকে।
পাকিস্তানের ২৫ লাখ জনগণও সৌদি আরবে কাজ করেন। তাঁদের পাঠানো অর্থ পাকিস্তানের নড়বড়ে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অপর দিকে তেহরানের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়াতে চায় ইসলামাবাদ। এর লক্ষ্য এ অঞ্চলে কৌশলগত ভারসাম্য ধরে রাখা। আরেকটি লক্ষ্য, দেশটির সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি। ইব্রাহিম রাইসির আশা পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্য বেড়ে বছরে হাজার কোটি ডলার হবে। এ ছাড়া পাকিস্তানের অন্তত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাসিন্দা শিয়া সম্প্রদায়ের। তাঁদের বড় একটি অংশ প্রতিবছর ধর্মীয় আচার পালনে ইরানে যায়।
পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে আরেকটি মিল রয়েছে। তা হলো বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশই ইসরায়েলের সমালোচক। রাইসির পাকিস্তান সফর শেষে এক যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের প্রতি ব্যবস্থা নিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। লক্ষ্য, ইসরায়েলের দুঃসাহসিকতা ও প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে দেশটির অবৈধ তৎপরতা বন্ধ করা।
পাকিস্তানের মানুষ আগে কখনো ইসরায়েলকে এতটা ঘৃণার চোখে দেখেননি।
চলতি মাসের শুরুতে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে হামলা চালায় ইসরায়েল। এ হামলার প্রসঙ্গেই নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে ইরান–পাকিস্তান যৌথ বিবৃতিতে। তবে ইরান যে পরে পাল্টা জবাবে ইসরায়েলে তিন শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছিল, সে বিষয়টি বিবৃতিতে টানা হয়নি।
ইসলামাবাদ যদি তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনায় না–ও নিত, তবুও পাকিস্তান–ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার যে জোরাল সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে এর ছিটেফোঁটাও নেই। গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা এর অন্যতম কারণ। পাকিস্তানের মানুষ আগে কখনো ইসরায়েলকে এতটা ঘৃণার চোখেও দেখেননি।
কিছু উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। ইসরায়েল–বিদ্বেষের জেরে পাকিস্তানের মিরপুর শহরে কেএফসির একটি রেস্তোরাঁয় আগুন দিয়েছেন লোকজন। তাঁদের ধারণা ছিল, প্রতিষ্ঠানটি ইসরায়েলকে সমর্থন করে। শুধু পাকিস্তানই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে একই কারণে পশ্চিমা অনেক প্রতিষ্ঠানের পণ্য বর্জনের হিড়িক পড়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তান–ইসরায়েল সম্পর্কে কিন্তু আশাজাগানিয়া উন্নতি হচ্ছিল। দুই দেশের সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদেরা উচ্চপর্যায়ের সফরও করেছিলেন। এখন চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। পাকিস্তানিরা ইসরায়েলকে এখন এতটা ঘৃণা করেন যে দেশটিকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা তুললে পাকিস্তানের কোনো সরকারই জনরোষের মুখে টিকতে পারবে না।
এসব সমস্যার কথা মাথায় নিয়ে হয়তো ইসরায়েলের বিষয়ে ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইবে না পাকিস্তান সরকার। কারণ, সরকারের অনেকেই মনে করেন, ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ায় ফলে সুবিধার চেয়ে বর্তমানে অসুবিধাই বেশি। আরেকটি বিষয় হলো ইসরায়েলের বিষয়ে পাকিস্তানের কোনো পদক্ষেপের ইঙ্গিত পাওয়া যাবে দেশটির ‘বড় ভাই’ সৌদি আরবের তৎপরতা থেকে।
গাজায় হামলার পর সৌদি আরবও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে। রিয়াদ যদিও বলেনি, ভবিষ্যতে তারা এ প্রক্রিয়ার দিকে আর এগোবে না। তবে এ ইঙ্গিত দিয়েছে যে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ওপরই সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি নির্ভর করবে।
ইসরায়েল যখন গাজায় জয় পাওয়ার দাবি করবে, তখন দেশটি পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্বে আরও ঘৃণার পাত্রে পরিণত হবে। অপর দিকে ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের বন্ধুত্বেরও কিছু সমস্যা রয়েছে। পাকিস্তানের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে জড়িত বলে মনে করা হয় এমন অনেক নীতিনির্ধারকের ধারণা, বন্ধু হিসেবে তেহরান নির্ভরযোগ্য নয়।
পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ পাইপলাইন নির্মাণে তেমন অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনাও কম। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করে বলেছে, এই পাইপলাইন চালু হলে পাকিস্তানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে।
আর চলতি সপ্তাহে রাইসির ইসলামাবাদ সফরের পরও দুই দেশের মধ্যে আগের মতোই অপ্রত্যাশিত অস্থিরতা থেকে যাবে বলে মনে হয়। ওই অস্থিরতার জেরেই গত জানুয়ারিতে পাকিস্তান–ইরান পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছিল।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পাকিস্তান ও ইসরায়েলের মধ্যে যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার আশা দেখা যাচ্ছিল, তা এখন অনেক দূরে সরে গেছে। ভবিষ্যতেও তা বাস্তবায়নে শক্তিশালী বাস্তবমুখী রাজনীতির প্রয়োজন পড়বে। ওদিকে দীর্ঘদিনের পশ্চিমা ও উপসাগরীয় মিত্রদের টপকে তেহরানের হাত ধরতে সত্যিকার অর্থেই ইসলামাবাদ প্রস্তুত আছে কি না—সে প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে।
—হামজা আজহার সালাম, লন্ডনভিত্তিক পাকিস্তানি সাংবাদিক। দ্য পাকিস্তান ডেইলি ও মাইগ্র্যান্ট নিউজের সহপ্রতিষ্ঠাতা তিনি। দ্য নিউজ ইন্টারন্যাশনালের পাকিস্তানের সংবাদদাতা হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন।

No comments:
Post a Comment