Tuesday, March 26, 2024

ঢাকায় বৈধ রেস্তোরাঁ আছে মাত্র ১৩৪টি

 


রেস্তোরাঁর মালিকদের দাবি, নিবন্ধন ও লাইসেন্সপ্রক্রিয়া অনেক জটিল। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার দপ্তরে দৌড়াতে দৌড়াতে তাঁরা হয়রান।


রেস্তোরাঁ ব্যবসা করতে চাইলে একজন বিনিয়োগকারীকে সরকারের সাতটি সংস্থার অনুমোদন ও ছাড়পত্র নিতে হয়। রেস্তোরাঁর জন্য প্রথমে নিবন্ধন ও পরে লাইসেন্স নিতে হয় সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে।


ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের সব সংস্থার প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও ছাড়পত্র নিয়ে ঢাকায় রেস্তোরাঁ ব্যবসা করছে মাত্র ১৩৪টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় রয়েছে ১২৮টি রেস্তোরাঁ।


ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি ঢাকা জেলায় পাঁচটি উপজেলা রয়েছে। সাভার, ধামরাই, কেরানীগঞ্জ, দোহার ও নবাবগঞ্জ—এই পাঁচ উপজেলার মধ্যে শুধু সাভারের ৬টি রেস্তোরাঁর লাইসেন্স রয়েছে।


বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ আইন অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রসহ নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে প্রথমে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় থেকে রেস্তোরাঁ ব্যবসা করার জন্য নিবন্ধন (অনুমতি) নিতে হয়।


এই নিবন্ধন পাওয়ার পর ডিসির কার্যালয় থেকেই রেস্তোরাঁ ব্যবসার লাইসেন্স (সনদ) নিতে হয়। আইন অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইয়ের পর এক বছরের মধ্যেই ডিসির কার্যালয় লাইসেন্স দেবে নিবন্ধন পাওয়া রেস্তোরাঁকে।


২০২২ সাল থেকে লাইসেন্স নিয়ে রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালনার প্রবণতা কিছুটা বাড়তে দেখা যায় বলে জানান ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা।


জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পাশাপাশি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে অনুমোদন ও ছাড়পত্র নিতে হয় একজন রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীকে।


এর বাইরে দই ও বোরহানির মতো বোতল বা প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্য কোনো রেস্তোরাঁ বিক্রি করলে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নিতে হয়।


ঢাকা জেলা প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, নিয়ম হচ্ছে নিবন্ধন পাওয়ার পর রেস্তোরাঁ নির্মাণের কাজ শুরু করবেন একজন বিনিয়োগকারী। একই সঙ্গে তিনি লাইসেন্স পাওয়ার জন্য সরকারি অন্যান্য সংস্থা থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও ছাড়পত্র নেবেন। লাইসেন্স পাওয়ার আগে কোনো রেস্তোরাঁ খাবার বিক্রি করতে পারবে না।


যেসব রেস্তোরাঁর লাইসেন্স আছে, শুধু তারাই বৈধ। আবার নিবন্ধন পাওয়ার এক বছরের মধ্যে লাইসেন্সের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রসহ আবেদন না করলে নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে।


ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কারওয়ান বাজারের ‘রেস্টুরেন্ট লা ভিঞ্চি’ ২০০১ সালে প্রথম লাইসেন্স নিয়ে রাজধানীতে রেস্তোরাঁ ব্যবসা শুরু করে। এরপর ২০০৩ সালে কারওয়ান বাজার ও ঠাঁটারীবাজার শাখার জন্য লাইসেন্স নেয় হোটেল সুপার স্টার রেস্টুরেন্ট লিমিটেড।


একই বছর আরও তিনটি প্রতিষ্ঠান রেস্তোরাঁ ব্যবসার জন্য লাইসেন্স নেয়। ট্রান্সকম ফুডস লিমিটেডের কেএফসি এবং পিৎজাহাটের শাখাগুলোও লাইসেন্স এবং নিবন্ধন নিয়ে ব্যবসা করছে।


জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পাশাপাশি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে অনুমোদন ও ছাড়পত্র নিতে হয় একজন রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীকে।


২০২২ সাল থেকে লাইসেন্স নিয়ে রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালনার প্রবণতা কিছুটা বাড়তে দেখা যায় বলে জানান ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ২০২২ সালে ১১টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিয়েছে। এরপর ২০২৩ সালে ৩০টি এবং ২০২৪ সালে এখন পর্যন্ত ১৫টি প্রতিষ্ঠান রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালনার জন্য লাইসেন্স নিয়েছে।


লাইসেন্স পেতে এখন ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আবেদন আছে ৬৪টি প্রতিষ্ঠানের; যারা ইতিমধ্যে রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালনার জন্য নিবন্ধন পেয়েছে। এসব তথ্য ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।


লাইসেন্স ছাড়া রেস্তোরাঁ ব্যবসা করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে গত ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজ নামের একটি ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর। আটতলা ওই ভবনে আগুনে নিহত হন ৪৬ জন। ভবনে ৮টি রেস্তোরাঁ ছিল।


যদিও ভবনটিতে রেস্তোরাঁ প্রতিষ্ঠার কোনো অনুমোদনই ছিল না। সেদিন আগুনে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ স্বজনদের নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে খেতে গিয়েছিলেন। কেউ কেউ ভবনে থাকা রেস্তোরাঁগুলোতে কাজ করে সংসার চালাতেন।


লাইসেন্স ছাড়া রেস্তোরাঁ ব্যবসা করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে গত ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজ নামের একটি ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর।


বেইলি রোডের ভবনে আগুনের পর রাজধানীজুড়ে অভিযান শুরু করে সরকারের পাঁচটি সংস্থা—রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। সংস্থাগুলোর ‘বিচ্ছিন্ন’ অভিযানে রেস্তোরাঁ ভেঙে ফেলা ও সিলগালা করে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।


ওই সব অভিযানে রেস্তোরাঁর কর্মীদের গ্রেপ্তার ও জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে ডিএমপি ১০ দিনে (৩-১৩ মার্চ) ১ হাজার ১৩২টি রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে ৮৭২ জনকে গ্রেপ্তার করে। যাঁদের প্রায় সবাই রেস্তোরাঁর কর্মচারী।


অন্যদিকে রাজউক ৩৩টি ভবনে অভিযান চালিয়ে সাড়ে ৪৭ লাখ টাকা জরিমানা করে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দুটি ভবন ও দুটি রেস্তোরাঁ সিলগালা করার পাশাপাশি ৭টি প্রতিষ্ঠানকে ৭ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। আর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন জরিমানা করেছে ২২টি প্রতিষ্ঠানকে, পরিমাণ ৬ লাখ ১৮ হাজার টাকা।


এর বাইরে সারা বছরই রেস্তোরাঁয় অভিযান চালায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সংস্থা।


বেইলি রোডের ভবনে আগুনের পর রাজধানীজুড়ে অভিযান শুরু করে সরকারের পাঁচটি সংস্থা—রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর।


রেস্তোরাঁ বলা যাবে কোনটিকে

বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ আইন অনুযায়ী, ৩০ জন বা এর চেয়ে বেশি মানুষ যেখানে বসে মানসম্মত খাবার টাকার বিনিময়ে খেতে পারবেন, সেটিই রেস্তোরাঁ।


বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির হিসাবে, ঢাকায় রেস্তোরাঁর সংখ্যা এখন ২৭ হাজারের মতো। তবে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা মনে করেন, রাজধানীতে রেস্তোরাঁর সংখ্যা ৪০ হাজারের মতো হবে।


রেস্তোরাঁর মালিকদের দাবি, নিবন্ধন ও লাইসেন্সপ্রক্রিয়া অনেক জটিল। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার দপ্তরে দৌড়াতে দৌড়াতে তাঁরা হয়রান।


নিবন্ধন ও লাইসেন্সপ্রক্রিয়া নিয়ে ব্যবসায়ীদের হয়রানির অভিযোগ প্রসঙ্গে ঢাকার জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমানের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেছে ।


এ জন্য ২০ মার্চ দুপুরে তাঁর কার্যালয়ে যান এই প্রতিবেদক। দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। বলা হয়, তিনি কার্যালয়ে নেই। পরে মুঠোফোনে কয়েক দফা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু রিং হলেও ফোন ধরেননি তিনি, খুদে বার্তা পাঠানো হলেও সাড়া দেননি।


রেস্তোরাঁর মালিকদের দাবি, নিবন্ধন ও লাইসেন্সপ্রক্রিয়া অনেক জটিল। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার দপ্তরে দৌড়াতে দৌড়াতে তাঁরা হয়রান।


তবে ঢাকা জেলা প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, সব বিষয় ছাড় দিলে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায় না। অনেকেই নিয়ম না মেনে ব্যবসা চালিয়ে যেতে চান।


নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের দেওয়া আইন ও বিধি মানতে রেস্তোরাঁর মালিকদের অনেকেই আসলে আগ্রহী নন। যেনতেনভাবে ব্যবসা করে বেশি মুনাফা করার প্রবণতা এখন অনেক বেশি দেখা যায়।


গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে দি রাজধানী হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স ২০১২ সালে নিয়েছিলেন ব্যবসায়ী এম এস আলম শাহজাহান।


তিনি ২২ মার্চ বলেন, রেস্তোরাঁ লাইসেন্স করার প্রক্রিয়া যদি সহজ করা হতো, তাহলে প্রায় সবাই নিবন্ধন ও লাইসেন্স করতে আগ্রহী হতেন। এমন কিছু কাগজপত্র জমা দিতে হয়, যেগুলো জোগাড় করতে করতেই মাসের পর মাস চলে যায়।


অনেকে এই ব্যবসা করার ধৈর্য ও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। নিবন্ধন ও লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে কয়েক দফা সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছিল; কিন্তু কাজ হয়নি।


বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির হিসাবে, ঢাকায় রেস্তোরাঁর সংখ্যা এখন ২৭ হাজারের মতো। তবে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা মনে করেন, রাজধানীতে রেস্তোরাঁর সংখ্যা ৪০ হাজারের মতো হবে।


রাজধানী হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের মালিক এম এস আলম শাহজাহান বলেন, ঢাকার এমন অসংখ্য ভবন আছে, যেগুলোর বয়স ৫০ থেকে ৬০ বছর। এসব ভবন করার সময় বর্তমান সময়ের মতো এত সুপরিকল্পিতভাবে নকশা এবং কোন তলা কী কাজে ব্যবহৃত হবে, তা ঠিক হয়নি।


কিন্তু রেস্তোরাঁর লাইসেন্স করতে হলে যে ভবনে রেস্তোরাঁ হবে, ওই ভবনের দলিলপত্র, ভবনের নকশাসহ অনেক তথ্য দিতে হয়। ভবনমালিকেরা ভাড়াটেদের দলিল ও নকশা দিতে চান না। এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে যাওয়া মানে দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যাওয়া।


নিবন্ধন পাওয়ার পরের ধাপে লাইসেন্স পেতে ঢাকার ডিসি অফিসে গত বছর আবেদন করেছে বাংলামোটর এলাকার আলম রেস্তোরাঁ ও মিনি চায়নিজ। এই রেস্তোরাঁর মালিকদের একজন ব্যবসায়ী খোরশেদ আলম। তাঁর সঙ্গে ২২ মার্চ কথা বলেছে।


তিনি বলেন, লাইসেন্সপ্রক্রিয়া অনেক বেশি জটিল। অনেক আগে থেকে তাঁরা ব্যবসা শুরু করলেও সব নথি জোগাড় করতে না পারায় এত দিন নিবন্ধন করেননি। গত বছর নিবন্ধন করেছেন।


রেস্তোরাঁ লাইসেন্স করার প্রক্রিয়া যদি সহজ করা হতো, তাহলে প্রায় সবাই নিবন্ধন ও লাইসেন্স করতে আগ্রহী হতেন।

এম এস আলম শাহজাহান, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী

যেসব নথি জমা দিতে হয়

রেস্তোরাঁ ব্যবসা করতে চাইলে প্রথমে নিবন্ধন করতে হয়। এ জন্য বেশ কিছু নথি ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দিতে হয়। এর মধ্যে নিজের জমিতে রেস্তোরাঁ করলে একরকম নথি এবং ভাড়া করা ভবনে করলে আরেক রকম নথি দিতে হয়।


নিজ জমিতে রেস্তোরাঁ করার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দিতে হয়: ১. জমির মালিকানার মূল দলিল, নামজারি, বাড়িভাড়া বা ইজারা চুক্তির সত্যায়িত কপি। ২, ভবন নির্মাণের অনুমোদন ও শর্ত পূরণসংক্রান্ত দলিলাদির সত্যায়িত কপি। ৩. ডিটেইল স্ট্রাকচারাল প্ল্যান, নকশা ও সুবিধাদির বিবরণসংক্রান্ত দলিলাদির সত্যায়িত কপি। ৪. ব্যবসা পরিচালনা–সংশ্লিষ্ট অনুমতিপত্র, ট্রেড লাইসেন্স বা সনদের সত্যায়িত কপি। ৫. ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে আবেদন ফি জমা দেওয়ার কপি। ৬. বিগত অর্থবছরে পরিশোধিত আয়কর প্রদানের প্রমাণকের সত্যায়িত ফটোকপি। ৭. ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপিসহ স্বত্বাধিকারী/অংশীদার/পরিচালকবৃন্দের নাম ও ঠিকানা। ৮. মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলস (সংঘস্মারক) এবং মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশনের (সংঘবিধি) সত্যায়িত ফটোকপি।


এসব নথি দেওয়ার পর রেস্তোরাঁর নিবন্ধন সনদ ইস্যু করা হয়। ইস্যুর তারিখের পরের এক বছরের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। লাইসেন্স নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কয়েকটি সংস্থার ছাড়পত্র জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে জমা দিতে হয়।


লাইসেন্স নিতে গেলে ভবনের মূল দলিলের ফটোকপি, ভবনের নকশার অনুমোদন জমা দিতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভবনমালিকেরা এসব নথি রেস্তোরাঁর মালিকদের দিতে চান না।ইমরান হাসান, বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক

এর মধ্যে রয়েছে নিবন্ধন সনদের সত্যায়িত কপি। ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে লাইসেন্স ফি প্রদানের মূল কপি এবং আবেদনকারীর অঙ্গীকারনামা। সিভিল সার্জন বা সরকার অনুমোদিত কোনো মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকের দেওয়া হোটেল কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের স্বাস্থ্যগত সনদ। হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্সের সত্যায়িত ফটোকপি।


বিগত অর্থবছরে পরিশোধিত আয়কর প্রত্যয়নপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি। মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) নিবন্ধন নম্বর ও প্রত্যয়নপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি। পরিবেশগত ছাড়পত্রের সত্যায়িত ফটোকপি। অগ্নি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস দুর্ঘটনার নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাসংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সনদপত্রের সত্যায়িত কপি। রাজউক/পৌরসভা/উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত প্ল্যান (পরিকল্পনা) ও ডিজাইনের (নকশা) সত্যায়িত ফটোকপি। স্বত্বাধিকারী পরিচালকদের ছবিসহ জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত ফটোকপি। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সনদপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি এবং কর্মচারীদের স্বাস্থ্য সনদপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি।


নিবন্ধন ও লাইসেন্স ফি

রেস্তোরাঁর আসনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে নিবন্ধন ও লাইসেন্স ফি নির্ধারণ করা হয়। আবার আসনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে রেস্তোরাঁর ধরনও ঠিক করা হয়। যেমন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে রেস্তোরাঁয় যদি ৩০ থেকে ১০০ আসন থাকে, তাহলে এর ধরন হবে ‘ডি’। সে ক্ষেত্রে রেস্তোরাঁয় শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা (এসি) থাকলে নিবন্ধন ফি তিন হাজার টাকা আর নন–এসি হলে দুই হাজার টাকা ফি দিতে হয়। রেস্তোরাঁয় ১০১ থেকে ২০০ আসন থাকলে এর ধরন হবে ‘সি’। সে ক্ষেত্রে এসি হলে সাড়ে তিন হাজার টাকা আর এসি না থাকলে আড়াই হাজার টাকা ফি হিসেবে সরকারি কোষাগারে দিতে হয়।


একইভাবে ২০১ থেকে ৩০০ আসন পর্যন্ত হলে তার ধরন হবে ‘বি’। আর ৩০০ আসনের বেশি থাকলে তার ধরন হবে ‘এ’। সে ক্ষেত্রে ‘বি’ ধরনের ফি (এসি) চার হাজার আর নন–এসি হলে তিন হাজার টাকা। আর রেস্তোরাঁর ধরন ‘এ’ (এসি) হলে সাড়ে চার হাজার টাকা, নন–এসি হলে সাড়ে তিন হাজার টাকা।


নিয়মের মধ্যে থেকে এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ব্যবসায়ীরা যাতে রেস্তোরাঁ ব্যবসা করতে পারেন, সেই পরিবেশ সরকারকে তৈরি করতে হবে। শুধু অভিযানের নামে রেস্তোরাঁর মালিকদের ভয় দেখিয়ে কার্যকর সমাধানে পৌঁছানো যাবে না।

অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান, সভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স

আবার লাইসেন্স করার সময়ও সরকারি কোষাগারে নির্ধারিত পরিমাণ ফি জমা দিতে হয়। যেমন রেস্তোরাঁর ধরন ‘এ’ হলে এবং এসি থাকলে ১৫ হাজার টাকা আর এসি না থাকলে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়। ‘সি’ হলে (এসি) ১৮ হাজার টাকা আর এসি না থাকলে সাড়ে ১২ হাজার টাকা, ‘বি’–এর জন্য (এসি) ২০ হাজার টাকা আর এসি না থাকলে ১৫ হাজার টাকা। রেস্তোরাঁর ধরন ‘এ’ হলে এবং এসি থাকলে ২৫ হাজার এবং নন–এসি হলে ২০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়।


রেস্তোরাঁর লাইসেন্স নেওয়ার তিন বছর পরপর তা নবায়ন করতে হয়। নবায়ন করতেও আবার নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়।


বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান বলেন, লাইসেন্স নিতে গেলে ভবনের মূল দলিলের ফটোকপি, ভবনের নকশার অনুমোদন জমা দিতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভবনমালিকেরা এসব নথি রেস্তোরাঁর মালিকদের দিতে চান না।


আবার সরকারের সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকার কারণে রেস্তোরাঁর মালিকদের ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। এত ভোগান্তি এড়াতে অনেকেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে লাইসেন্স করেননি।


তবে লাইসেন্স না করলেও অগ্নি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস দুর্ঘটনার নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাসংক্রান্ত কর্তৃপক্ষের সনদপত্রের বেশির ভাগ রেস্তোরাঁমালিক নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন তিনি।


নগর-পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, ঢাকার রেস্তোরাঁগুলোতে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগের পাশাপাশি হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাই রেস্তোরাঁগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনা দরকার।


জবাবদিহি দরকার

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২১ সালে দেশের রেস্তোরাঁ খাত নিয়ে একটি জরিপ করে। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাতের অবদান জানতে জরিপটি করা হয়। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে হোটেল ও রেস্তোরাঁ ছিল ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৭৪টি। এখন সংখ্যাটি ৫ লাখের বেশি হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি।


তিন বছর আগে করা বিবিএসের ওই জরিপ অনুযায়ী, রেস্তোরাঁ খাতে যুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ ৭২ হাজার। শুধু পুরুষ নন, রেস্তোরাঁগুলোতে এক লাখের বেশি নারীও কাজ করেন।


নগর-পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, ঢাকার রেস্তোরাঁগুলোতে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগের পাশাপাশি হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাই রেস্তোরাঁগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনা দরকার।


অন্যদিকে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি দেশের সব রেস্তোরাঁসেবাকে একটি সংস্থার অধীন এনে লাইসেন্স প্রদানের দাবি তুলেছে। একই সঙ্গে তারা নিবন্ধন ও লাইসেন্সের জন্য এত কাগজপত্র কেন লাগবে, সে প্রশ্নও তুলেছে।


নগর–পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, নিয়মের মধ্যে থেকে এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ব্যবসায়ীরা যাতে রেস্তোরাঁ ব্যবসা করতে পারেন, সেই পরিবেশ সরকারকে তৈরি করতে হবে।


শুধু অভিযানের নামে রেস্তোরাঁর মালিকদের ভয় দেখিয়ে কার্যকর সমাধানে পৌঁছানো যাবে না। নিবন্ধন ও লাইসেন্সপ্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়টি ভাবতে হবে।


তবে যেসব রেস্তোরাঁ অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে, এ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া ঠিক হবে না বলে মনে করেন অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, রেস্তোরাঁ ব্যবসা তদারকির দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে কোনো উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত কাজে আসবে না।

No comments:

Post a Comment

Is Musk growing distant from the Trump administration over tariffs?

         Tesla CEO Elon Musk   Elon Musk has made several posts on social media criticizing a top White House adviser for US President ...