মাদারীপুরের কালকিনিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাহমিনা বেগমের সমর্থকদের মিছিলে হাতবোমা হামলার ঘটনা ঘটে। গতকাল বিকেলে উপজেলার লক্ষ্মীপুর এলাকায়
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরুর পর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মী–সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা থামছে না। নির্বাচনী প্রচার ক্যাম্প ভাঙচুর ও পোস্টার ছেঁড়ার ঘটনাও রয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুটি স্থানে সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মাদারীপুরে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী–সমর্থকদের ওপর বোমা হামলা এবং ফরিদপুরে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে।
এর আগের দিন চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর এক সমর্থকের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে গত চার দিনে ২১ স্থানে নির্বাচনী সংঘাতের ঘটনা ঘটল। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনাই বেশি।
গতকাল মাদারীপুর, গত বুধবার চট্টগ্রাম, যশোর ও ময়মনসিংহে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী–সমর্থকদের ওপর হামলা হয়েছে। দুই দিনে হামলার ঘটনা ঘটেছে চারটি। আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে এসব হামলার অভিযোগ উঠেছে।
এসব হামলার ঘটনায় অনেক স্থানে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকেরা অভিযোগ বা মামলা করতে গেলেও থানা-পুলিশ তা আমলে নিচ্ছে না, এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গত চার দিনে ২১ স্থানে হামলা ও সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। তিন স্থানে হামলা ও মারামারির ঘটনায় ২৩ জন আহত।
মাদারীপুরে বোমা হামলা
আরও সংঘাত
মাদারীপুরের কালকিনিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুস সোবহান গোলাপের সমর্থকদের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাহমিনা বেগমের মিছিলে বোমা হামলার অভিযোগ উঠেছে। এতে লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান তোফাজ্জেল হোসেনসহ কমপক্ষে ১০ জন আহত হন। গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে উপজেলার লক্ষ্মীপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর-৩ (কালকিনি, ডাসার ও সদরের একাংশ) আসনে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র ঈগল প্রতীকের প্রার্থী তাহমিনা বেগমের পক্ষে একটি মিছিল বের হয়। এতে নেতৃত্ব দেন লক্ষ্মীপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান তোফাজ্জেল হোসেন।
মিছিলটি লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের মৃধার মোড় থেকে হাবিবুর সরদারের বাড়ি পর্যন্ত গেলে নৌকার সমর্থক আওয়ামী লীগ নেতা ফজলুর হক ব্যাপারীর সমর্থকেরা তাঁদের বাধা দেন।
পরে মিছিলে অতর্কিত কয়েকটি হাতবোমা নিক্ষেপ করা হয়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। হাতবোমার বিস্ফোরণে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফজলুর হক ব্যাপারী মুঠোফোনে বলেন, ‘আমি নৌকার প্রার্থীর প্রচারণায় রয়েছি। স্বতন্ত্র প্রার্থীর মিছিলে আমরা কেন বাধা দেব? তারাই আমাদের নেতা-কর্মীদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়।’
কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজমুল হাসান বলেন, বোমা বিস্ফোরণের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়েছে।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক রিদুয়ানুল ইসলামের ব্যবহৃত মাইক্রোবাস ভাঙচুর করে দুর্বৃত্তরা। গতকাল বেলা ১১টায়সাতকানিয়ায় গুলি
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) এক চেয়ারম্যানের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এ সময় তিনটি গাড়ি ও ওই প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প ভাঙচুর করা হয়। গত বুধবার দিবাগত রাতে উপজেলার পশ্চিম ঢেমশা ইউনিয়নের ইছামতী আলীনগর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভী। ওই আসনে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ মোতালেব স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে আবদুল মোতালেবের সমর্থক পশ্চিম ঢেমশা ইউপি চেয়ারম্যান রিদুয়ানুল ইসলামের বাড়ি লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তরা গুলি ছোড়ে। পুলিশ বলছে, এ ব্যাপারে এখনো থানায় কেউ অভিযোগ করেননি।
অবশ্য ইউপি চেয়ারম্যান রিদুয়ানুল ইসলামের অভিযোগ, গুলিবর্ষণ ও ভাঙচুরের সময় পুলিশের একটি টহল দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
এ ঘটনার জন্য তিনি সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিনের সমর্থকদের দায়ী করেন। অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্যের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যশোরে গাড়িবহরে হামলা
যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ইয়াকুব আলীর গাড়িবহরে হামলা হয়েছে। এ সময় একাধিক ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী ইয়াকুব আলী অভিযোগ করেন, গত বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাঁর গাড়িবহর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের মথুরাপুর মোড়ে পৌঁছালে বর্তমান সংসদ সদস্য স্বপন ভট্টাচার্যের ছেলে সুপ্রিয় ভট্টাচার্য ও ভাগনে উত্তম চক্রবর্তীর নেতৃত্বে কিছু যুবক গাড়িবহরে হামলা চালায়।
এ সময় তাঁর বহরে থাকা ছয়টি মোটরসাইকেল ও দুটি মাইক্রোবাস ভাঙচুর করা হয়। এ ঘটনায় অন্তত আটজন আহত হয়েছেন। পরে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
অভিযোগের বিষয়ে সুপ্রিয় ভট্টাচার্য সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা তখন পাশের ইউনিয়নে নির্বাচনের প্রচারণায় ছিলাম। তখন শুনতে পাই, ইয়াকুব আলী সাহেব তাঁর লোকজন নিয়ে নৌকার কর্মীদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করছেন।’
পোস্টার লাগানো নিয়ে ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শামীম হক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী এ কে আজাদের সমর্থকদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে।
গতকাল দুপুরে ফরিদপুর সদর উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের ওমেদিয়া বটতলা বাজারে ওই ঘটনা ঘটে। মারামারিতে দুই পক্ষের দুজন আহত হন।
শরীয়তপুরেও নির্বাচনী প্রচারণায় বাধার অভিযোগ উঠেছে। শরীয়তপুর-২ (নড়িয়া-সখীপুর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী খালেদ শওকত আলী অভিযোগ করেছেন, তাঁর সমর্থকদের প্রচারে বাধা দেওয়া হচ্ছে ও পোস্টার ছেঁড়া হচ্ছে।
আরও সংঘাত
নাটোর-৩ (সিংড়া) আসনে নৌকা ও ঈগল প্রতীকের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ১১ জন আহত হয়েছেন। গত বুধবার রাতে উপজেলার ইটালী ইউনিয়নের সাতপুকুরিয়া বাজারে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জুনাইদ আহমেদ ও আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী শফিকুল ইসলামের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ওই ঘটনা ঘটে। এ সময় চারটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়।
সিংড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম বলেন, নির্বাচনী প্রচার নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারির খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক ছাত্রলীগের এক নেতাকে নৌকার সমর্থকেরা বৈঠা দিয়ে মারধর করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গুরুতর আহত মো. সাদেক হোসেন ভূঁইয়াকে প্রথমে নান্দাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন।
সাদেক হোসেন উপজেলার গাংগাইল ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি। তিনি বলেন, গত বুধবার রাতে তিনি সুন্দাইল গ্রামে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বর্তমান সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল আবেদীন খানের পক্ষে পোস্টার-ব্যানার বিতরণ করছিলেন তিনি।
এ সময় নৌকার প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালামের সমর্থকেরা তাঁর ওপর হামলা চালান। ওই ঘটনায় সাদেক গতকাল সকালে ১৫ জনের নামে নান্দাইল মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। মারধরের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মোবারক হোসেন নামের একজনকে আটক করেছে পুলিশ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর) আসনে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী ফিরোজুর রহমানের (কাঁচি) পোস্টার ছিনিয়ে নেওয়ায় নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর সমর্থক ছাত্রলীগের এক নেতাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত বুধবার রাত ১০টার দিকে এই জরিমানা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মোশারফ হোসাইন। ছাত্রলীগের ওই নেতারা নাম শেখ মঞ্জুর ই মাওলা ফারহান।
তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর সমর্থক।
এই আসনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করা ফিরোজুর রহমান। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করছেন তিনি।
শরীয়তপুরেও নির্বাচনী প্রচারণায় বাধার অভিযোগ উঠেছে। শরীয়তপুর-২ (নড়িয়া-সখীপুর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী খালেদ শওকত আলী অভিযোগ করেছেন, তাঁর সমর্থকদের প্রচারে বাধা দেওয়া হচ্ছে ও পোস্টার ছেঁড়া হচ্ছে।
তিনি গতকাল রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে এ–সংক্রান্ত দুটি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। এ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম। আর খালেদ শওকত আলী যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য।
অভিযোগ অস্বীকার করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এনামুল হক বলেন, কোথাও কারও পোস্টার ছেঁড়া হয়নি, কাউকে প্রচারে বাধাও দেওয়া হচ্ছে না।
হামলার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার
বোমা হামলায় আহত একজন মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীননাটোরে প্রতীক বরাদ্দের পর গত তিন দিনে তিন সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের সঙ্গে দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তিনটি সংঘর্ষের ঘটনায় পৃথক তিনটি মামলা হয়েছে।
নেত্রকোনা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের ওপর আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সমর্থকদের হামলার অভিযোগে করা মামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত বুধবার রাতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে নিজ বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম খোকন মিয়া (৪৮)। তিনি কেন্দুয়ার মাসকা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।
পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া আংশিক) আসনে প্রচারে নেমেই পদে পদে বাধার অভিযোগ তোলা স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ সাঁথিয়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন।
তবে তা মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়নি। জানতে চাইলে সাঁথিয়া থানার ওসি আনোয়ার হোসেন বলেন, তিনি কোনো মামলা করেননি। একটি অভিযোগ দিয়েছেন। তাঁরা সেটি তদন্ত করছেন।
বিএনপি এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। মনোনয়নবঞ্চিত আওয়ামী লীগের নেতারাই দলের মনোনীত প্রার্থীদের বিপক্ষে লড়ছেন।
আসন্ন সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরুর চার দিন যেতে না যেতেই একের পর এক হামলার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে। সামনের দিনগুলোতে এটি আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।



No comments:
Post a Comment